Sunday, 25 July 2021

WEB MAGAZINE. GHORSOWAR. ঘোড়সওয়ার ওয়েব ম্যাগাজিন


  Editor . Nihar Ranjan Das

 Siliguri. Darjeeling. India.
🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹
                    জয়ন্ত সমাজদার

অক্ষমের ক্রোধ   ( ছোট গল্প 

                   দামোদর পর্বত, নামের সাথে মানানসই পর্বততূল্য দেহ, চওড়া বুক, সরু কোমর, মহাভারতের ভীমের কথা মনে এসে যায়, হাড়গুলি অত্যন্ত চওড়া, চোখের কোন লাল,কম কথার মানুষ, কথা প্রায় বলে না বললেই চলে, ঘাড়  ছাপিয়ে নেমেছে একরাশ অবাধ্য চুল, এলোমেলো।

      অসীম শক্তির কারণেই, যেন বজ্রগর্ভ মেঘ, অনেকটা অব্যক্ত কাঠিন্য, আর যন্ত্রনা সারা শরীরময়, রেগে গেলে পেশীগুলি ফুলে ফুলে ওঠে,কথা সরে না মুখে, শব্দহীন কাঠিন্যের কারণেই দামোদরকে ভয় পায় লোকে, হয়তো একটু এড়িয়েই চলে।

     ডাকনাম দামু, গ্রামের ছেলেবুড়ো দামু নামেই ডাকে, দামুর কাজ খেজুর রস সংগ্রহ, বিপুল বিশাল সুখমারির বিলের ধার ঘেঁষে সার সার খেজুর গাছ, বাপের লাগানো, বাপ তো মরেছে কবেই...জমিটাও দামুর..সেই রস কতক বেচে হাটেবাজারে পল্লীতে ভোরের ঝোঁকে, চিলুচিলু করে কিনে নেয় লোকে....রোদ কড়া হয়ে উঠলে রসের রঙ বদলায়, ঝাঁজ বাড়ে, দাম বাড়ে বই কমে না, তারও খদ্দের যথেষ্ট, দামু নিজেও তার অলস গলায় ঢেলে নেয় দুই তিন গেলাস, কিন্তু নেশা হয় না।

      বাকি রস , পরিমাণ নেহাত কম নয়, চলে যায় গুড় তৈরিতে, তার চাহিদাও নেহাত কম নয়, শীতের দিনে তাই রামুর পরিশ্রম ভারী...হাতে বেশ কিছু পয়সার আমদানি ফি বছর, ঝনঝন করে বাজে পয়সাগুলি।বেশ খানিকটা জমি নিয়েই দামুর বাড়ি, বাড়ির মধ্যেই খেজুর গাছ বেশ কয়েকটা, ছোট্ট একটা পুকুর, সেখানে খেলে বেড়ায় হাঁসের দল।

       হাতে পয়সা থাকলে শরীর উথাল দেয়, একা থাকাটা বেশ কষ্টকর, দামুর নেই কেউ ত্রিভুবনে, মা তো সেই জন্ম দেওয়ার সময়ই, বাপ গেলো, তা হয়ে গেলো বেশ কয়েকটা বছর... নাঃ, দামুকে মোটেও দোষ দেওয়া যায় না, তাই বিয়েটা করেই ফেললো দামু গতবছর, এই শীতেরই সময়...মালতী...পাশের গ্রামের মেয়ে, বাপ নৌকা চালায়, মাছ ধরে,.... চাবুকের মতোই যৌবন উদ্ধত শরীর মালতীর, গায়ের কালো রঙে কালাচ সাপের তীক্ষ্ণ নৃশংসতা..দামুর পেশীবহুল বৃহৎ বুকের উপর নিভৃতরাতের নিস্তব্ধতায় মালতীর পিচ্ছিল সর্পিল আনাগোনা। সাপ বিষ ঢালতে আসে, মালতী সাপ হয়েও যেন সাপ নয়...রাত্রির গভীর নীরবতায় সে যেন দামুর সমস্ত অস্তিত্ত্বের অহংকারকে শুষে নিতে চায়, বারংবার।

      ক্লান্তি ক্রমশঃ গ্রাস করে দামুকে, চোখে নেমে আসে ঘুম, এক দুরূহ শীতল স্রোতের অবগাহনে, যতই সে তরতর করে গাছে আরোহণ করুক না কেন, হাতের স্বেদালোকিত পেশীর বিদ্যুৎবিলাসে, সোনালী রোদের আভায়  যতই কাস্তের ধার ঝিকিয়ে উঠুক না কেন, কালাচের নীরবসরব অভিযানে বারবার হেরে যায় দামু, ঠিক অক্ষম তাকে বলা চলে না, কোথাও একটা খামতি, পারঙ্গমহীনতা, স্বেদবিন্দুর সাথে সেইসব দীর্ঘশ্বাস বিছানায়, বালিশে অবিরত ঝরে যায়, ঝরে যায় ক্ষনিক শিউলির মতোই।

       মালতী হিসহিস করে ওঠে, তৃপ্তিহীনতায়, "বিয়া করছিলা ক্যান? পারো না যখন?" একটা কঠিন ক্রোধ ক্রমশঃ দানা বাঁধে দামুর মনে...দিনের পর দিন...একই কর্কশ বাক্য, একই বাক্য..একই উত্তরহীন জিজ্ঞাসা...কিছুই নেই করার, মালতীর ওই কৃষ্ণবর্ণ, স্বেদপিচ্ছিল, অগ্নিগর্ভ,নিরাবরণ দেহের অসীম আকর্ষণী ক্ষুধা পরিতৃপ্ত করে, মালতীর মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা সত্যিই নেই তার, অক্ষমের ক্রোধ ,মাটিতে গেঁথে ফেলা সাপের মতোই বারবার মাটিতে লেজ আছড়ায়।

         এমনই একদিন।

         দামু ভোরেরবেলায় গাছ থেকে হাঁড়ি নামাচ্ছে, একটা একটা করে, কিছু মৌমাছি এদিক সেদিক,  সদ্যপ্রকাশিত আলোয় পৃথিবীর রূপরস প্রতিভাত হচ্ছে, খগেন খুড়োকে দেখা গেলো বিলের পাশে, গায়ে চাদর, হাতে লাঠি, দামুকে দেখে খুড়ো অবাক, ভালোভাবে দেখেশুনে, কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে খুড়ো বলে উঠলো.."হাঁ রে দামু! তুই হেথায়? লখাই তোর বাড়িতে কী করে?"

      চেনা যুবক লখাই, ক্ষয়াটে চেহারা, গাঁজার কলকে হাতে তাকে প্রায়ই দেখা যায় রাধামাধব মন্দির লাগোয়া বটগাছের ছায়াতে, অর্ধচেতন...সেই লখাই।

        কাজ মাথায় ওঠে দামুর। বাড়ির দিকে দৌড়োতে থাকে সে, হাতের কাস্তেটা অস্থির হয়ে ওঠে বড্ড....দরজা খোলে মালতি...ঘুম জড়ানো তৃপ্ত চোখ, পোশাক এলোমেলো, হেথায় হোথায় দংশন চিন্হ, দামুর লক্ষ্য প্রবল...হাঁফাতে থাকে দামু....

        তাও.....

     " লখাই আসছিলো?" আকস্মিক প্রশ্নে ঝাঁকুনি খায় মালতি...দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে সে,

    " হ্যাঁ, আসছিলো তো...ক্যান?...তাতে তোর কী?"

     " ক্যান আসছিলো?"

      শিথিল লেপটে যাওয়া অসহ্য সিঁদুর হাতের আড়ালে মুছে নিয়ে কালাচ হিসহিস করে ওঠে.......

     " বেশ করছিলো... আসছিলো... তোর বাপের কি?" 

      অক্ষম ক্রোধ দামুর, সবল হাতের এক ধাক্কায় বিছানায় ছিটকে পড়ে মালতি, একটা শব্দও করতে পারে না।

      সময় চলে যায়...বাইরের পৃথিবী ক্রমশঃ সজীব হয়ে ওঠে, নিস্তব্ধ ঘরের অন্ধকারের আবছায়া বাস্তবতায় পেশীবহুল শরীর নিয়ে দামু বসে থাকে মেঝেতে....মালতি শুয়েই থাকে, একভাবে শুয়েই থাকে..অনবরত শুয়েই থাকে...দুটি চোখ ঈষৎ খোলা, মুখে একটা চাপা ব্যঙ্গের হাসি...উঠতেই চায় না যেন, কিছু মাছি ওড়ে এদিক ওদিক।

     অগত্যা, দামুকেই উঠতে হয়...হাত আর কাস্তেটা ধুয়ে ফেলতে হবে...

      বড্ড রক্ত লেগে আছে।
                            -----
                        ঝুমুর পান্ডে 


প্রেম (অণুগল্প)

         
ওই তো শিমুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে শিমুল। হ্যাঁ, ওইতো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে এসে দাঁড়াল কৃষ্ণচূড়া। হ্যাঁ, ওইরকম ই কথা ছিল ! বেশ কয়েকদিন চেট করার পর। আর কারও র একাউন্টেই তো নিজের ছবি ছিল না! ওই ফুলের ছবিই ছিল! তিরিশ বছর পর শিমুল তো ওই রকমই আছে। আড়চোখে দেখল কৃষ্ণচূড়া। হ্যাঁ, শিমুল ও দেখল কৃষ্ণচূড়া ও আগের মতোই আছে।সরে আসছে শিমূল ! কৃষ্ণচূড়া কি ওকে দেখে ফেলল? সরে আসছে পা পা করে কৃষ্ণচূড়াও!না,_দেখেনি শিমূল! একটা কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি উড়তে উড়তে শিমুলের গায়ে এসে পড়ল! একটা শিমুল ফুল ও কৃষ্ণচূড়ার গায়ে পড়ল!এখন দুজনেই খুব দ্রুত দুদিকে হাঁটতে লাগল.......
                         ---------
                     মিলি অধিকারী
                           
শিকড়ের টান (ছোট গল্প) 

বেশ কয়েক বছর পর নিজেদের পৈত্রিক বাড়িতে বাবা মায়ের কাছে আসে অঞ্জনা। কয়েক বছরে রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, মানুষজন সবকিছুই যেন অনেক পাল্টে গেছে! হয়তো এটাই স্বাভাবিক। সময় আর পরিস্থিতি সবকিছুকে পাল্টে দেয় নিজস্ব নিয়মে। 

অঞ্জনাও কি আগের মতো আছে! সেও কি এখন ইচ্ছে করলে সেই আগের মতন গোল্লাছুট, দারিয়াবান্ধা খেলা বা নদীতে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ডুব সাঁতার কাটা, বন্ধুদের সাথে রান্নাবাটি খেলা, পুতুলের বিয়ে দেওয়া, পাশের বাড়ির কুলগাছ থেকে কুল চুরি করে খেয়ে বকুনি শোনা... এইসব পারে ! না, পারে না। তাইতো এতদিন পর আনোয়ারা, শিবু, মঞ্জু ও সুজাতাদের সঙ্গে তার দেখা হয়ে খুশিতে মন ভরে গেলেও সেই পুরনো দিনে ফেরা হয় নি । তারা অঞ্জনাকে নিজেদের একজন না ভেবে অতিথির মতো খাতির যত্ন করছিল। অঞ্জনার খুব ইচ্ছে ছিল এবার নদীতে চান করতে গিয়ে  পানকৌড়ির মতো ডুব সাঁতারে অনেক দূরে চলে যাবে। কিন্তু দীর্ঘদিন অভ্যাস নেই বলে বাল্যবন্ধুরা তাকে নদীতে নিয়ে যাওয়ার সাহস দেখায়নি। 
অঞ্জনা কাউকেই বোঝাতে পারছে না যে সে  তাদেরই একজন। ছোটবেলা গ্রামে কোনো বাড়িতে অনুষ্ঠান হলে মাটির উঠোনে চাদর পেতে সবাই মিলে কতবার খেয়েছে পরম তৃপ্তিতে। এখন তারা সেই অঞ্জনাকে চেয়ার টেবিলে বসিয়ে থালা বাটি সাজিয়ে খেতে দেয়। এই পরিবর্তন অঞ্জনার ভালো লাগ না। 

অঞ্জনাকে গ্রামের সবাই ভালোবাসে। কাছে আসে, কিন্তু এতবছর বাদে ওদের কাছে অঞ্জনা যেন অন্য জগতের মানুষ হয়ে গেছে! একজন তো ওকে বলেই বসলো, "তেলে জলে কি আর মেশে গো দিদি। তোমরা আধুনিক জগতের শহুরে সুখী  মানুষ। আমরা রোদে জলে খেটে খাওয়া মানুষ।" 

অঞ্জনা ভাবতে থাকে সত্যিই কি শহরের মানুষেরা সুখী! গ্রামের মানুষ সহজ, সরল সাধারণ জীবন যাপন করে। প্রকৃতির কোলে, প্রকৃতির সাথে এরা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।  আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে জিতলো আর কে হারলো সেটা না জানলে সুজাতা, মঞ্জুদের কি ক্ষতি হবে! এরা কি করবে জেনে যে ফিজিক্স বা কেমিস্ট্রিতে কে নোবেল পুরস্কার পেলো। ল্যাকমে, লোরিয়েল বা ম্যাকের লিপস্টিকের নাম না জানলে কি অসুবিধে!  জিম, পার্লার, বডি স্পা এসব না জেনেও এরা তো দিব্যি বেশ আছে। মিনারেল ওয়াটার বা অর্গানিক প্রোডাক্ট এদের জীবনে কোনো প্রয়োজন নেই। চাপা কলের জল খেয়েও সুস্থ ও দীর্ঘজীবী এরা। হাইজিন, হেলদি এই পোশাকি শব্দগুলো কি হবে জেনে তাদের? 
গ্রামের মুক্ত আকাশ, বাতাস আর নিজের মেহনতে ফলানো ফসল, পুকুর, নদী-নালার রাসায়নিক পদার্থ বিহীন মাছ খেয়ে এরা বেশ অনায়াসে জীবন যাপন করছে। প্রকৃতিই এদের ভ্যাকসিন। ইমিউনিটি এদের এমনিতেই বেশি রোদে, বৃষ্টিতে ভিজে। হয়তো কোনো ভাইরাস এজন্য ওদের কাবু করতে পারে না। অঞ্জনার কেবলই মনে হয় এই মানুষগুলো পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সুখী। কারণ ওদের চাহিদা খুব সামান্য। তাই হতাশা বা প্রত্যাশা নেই বললেই চলে।  

অঞ্জনার মনে প্রশ্ন জাগে, শহরের বিলাসবহুল জীবন কি সত্যিই সুখের হয়। নাকি শুধুমাত্র একটা ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগিতা !! যেখানে মানুষ শুধু ছুটছে আর ছুটছে!! এর শেষ কোথায় কেউ জানে না। তবুও অবিরাম ছুটে চলা....।
                          ---------
                  End of 5th page 


No comments:

Post a Comment