Wednesday, 2 June 2021

ঘোড়সওয়ার ওয়েব ম্যাগাজিন কবি বিবেক কবিরাজ এর উদ্দেশ্যে স্মৃতি চারণ


 
বিবেক কবিরাজ: একটি ব্যক্তিগত কথন
শৌভিক রায়


সম্পাদক ভাইটির কথায় একটু বিস্মিত হয়েছিলাম। আমাকে সম্বর্ধনা? হঠাৎ? আহামরি কোনও লেখক-কবি নই আমি! সম্পাদনার ক্ষেত্রেও এমন কিছু করিনি যা বলবার মতো। সাহিত্য সমাবেশ একটু এড়িয়েই চলি। সেভাবে কোথাও লেখা ছাপাও হয় না। আমার মতো অকিঞ্চিৎকরকে সম্মাননা দেওয়ার জন্য এই সম্পাদক ভাইটি উঠেপড়ে লাগল কেন! অনেক পরে বুঝেছিলাম যে, এই সম্বর্ধনা দেওয়ার পেছনে বিবেক কবিরাজের বড় ভূমিকা ছিল। সম্পাদক ভাইটিকে ও-ই সাতপাঁচ বুঝিয়েছিল।  

বিবেক আসলে এরকমই। নিজে লুকিয়ে থেকে চুপিসারে এমন কিছু কাজ করে গেছে যা কখনই আমার মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। খুব সাধারণ মানুষদের নিয়ে ও কাজ করেছে, তাদেরকে পরিচিত করেছে। আজকাল যেখানে নিজের বাবা-মা'কেই আমরা ভুলতে বসেছি, সেখানে দাঁড়িয়ে বিবেকের এই উদারতা ও মহানুভবতা নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। এই জন্যই বিবেক সবার চাইতে আলাদা। 

নিজের পত্রিকা 'মুজনাই' সম্পাদনার সূত্রেই ওর সঙ্গে প্রথম পরিচয়। গত শতকের আশির দশক থেকে চলা শুরু হলেও, মাঝে দীর্ঘদিন 'মুজনাই` বন্ধ ছিল। অনলাইন ও সমাজ-মাধ্যমের সুযোগ নিয়ে যখন 'মুজনাই' আবার বইতে শুরু করে, তখনই 'মুজনাই` গ্ৰুপে ওর পোস্ট করা লেখা থেকেই ওকে চেনার সূত্রপাত। এরকম সময়ে বিবেকের ওর দুই একটি লেখা তুলে ধরছি-  
  
শুভ দিবস

"তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ"

ভোর ভাবনায় মেলেছি আখি
দেখি রাত্রি সাঙ্গ হল
খোকা খুকু তোমরা এবার
নিজের নিজের বই খোলো
বেশ কটা দিন খুশীর আমেজ
রইলো,আছে, থাকুক রেশ
তারই মাঝে পড়তে হবে
পূজোর ছুটি হয়েছে শেষ।
বাৎসরিক পরীক্ষা এলো বলে
তোমরা সবাই তৈরী তো
নতুন শ্রেণীতে যেতে হবেই
পুরানোটাকে করে বিগত।
সেখানেতে ও আরও মজা
নতুন নতুন বই নিয়ে
নতুন প্রভাত আসুক আবার
জাতির ভবিষ্যত হয়ে

            বিবেক কবিরাজ©

Searching Born
     Vivek kabiraj

I have been searching in deep
I have been searching the nude in silence zone,
Deep and deeper....
I saw focus of a mid-town.

Copyright©Vivek Kabiraj


শরৎ(2015)
    বিবেক কবিরাজ

দূর-পাল্লা মাঝি মাল্লা
বদর বলে যাত্রা শুরু,
মেঘ গুড়্ গুড়্ আঁধার দুপুর
বুকটা ভয়ে দুরু দুরু!

আকাশ যেথায় মেঘেরা সেথায় 
বজ্রনাদে কড়কড়াৎ
বৃক্ষরাশি উঠলো নাচি
বৃষ্টিসুরে তৎপরাৎ।

রামধনু রঙ সেজেছে সং
আকাশটা ওই রূপবাহারে
রডোডেনড্রন হাওয়ার কাঁপন
জলতরঙ্গ ঘুম-পাহাড়ে।

দূরে গাংচিল করছে মিছিল
প্রকৃতির এই রূপ-খেয়ালী
জলে টুপ টুপ ডাহুক-ডাহুক
পানকৌড়ির ডুব হেঁয়ালী।

একটানা সুর রাত্রি-দুপুর
মন্ডুকেরই জলসা বাসর
ঝমঝমিয়ে গমগমিয়ে
টিনের চালে বৃষ্টি-কাঁসর।

বর্ষা শেষে মিষ্টি হেসে
চামর দোলায় কাশের বন
শিউলি সুবাস পূজোর আভাস
মা আসছেন মাতলো মন।

সব কষ্ট হোক নষ্ট
মায়ের কৃপা স্নেহ-পরশে
পুষ্পরেণু আলোর বেণু
উঠলো বেজে সুখ-হরষে।।

কপিরাইট©বিবেক কবিরাজ


দোঁহে(২০০৯)
    বিবেক কবিরাজ

পথ চলতে থমকে গেলাম একটি কুটির দেখে
কুটির খানি বলল- এসে মনখানি যাও রেখে,
পাতায় ছাওয়া সেই কুটির
তক্তাপোষ আর মন জুটির
স্নিগ্ধ ছোঁয়ার ভালোবাসার প্রেম সমাদর নিই মেখে।

নদী মাঝে বাইছি তরী বলল নদীর জল,
ভুবন মাঝি শোনাও তোমার হৃদি প্রেম গজল
ছলাৎ ছলাৎ শব্দেতে
ছন্দ তালের সঙ্গীতে
উদোম স্রোতে পরিয়ে বেড়ি উথাল মন আজ হোক নিচোল।

আসমানের ওই দূর দিগন্তে যাচ্ছে উড়ে মন পাখি,
মেঘ বলল আমার মতো বন্ধু পেতে চাও নাকী?
উদাস হাওয়ায় ভেসে থেকে
জলকণার আতর মেখে
দোঁহে মিলে প্রেম তুলিতে স্বপ্ন-নীলের ছবি আঁকি।।

কপিরাইট©বিবেক কবিরাজ(২০০৯)

ওর নিজের উল্লেখ করা সাল থেকে এটা স্পষ্ট যে, বিবেকের সঙ্গে পরিচয় কম দিনের নয়। ফেসবুকের মুজনাই গ্রুপে (অধুনা আর্কাইভ করে রাখা) বিবেকের অজস্র লেখা আজও আমার কাছে রয়েছে। মুদ্রিত সংখ্যাতেও ওর লেখা মুজনাইয়ের সম্পদ বলে মনে করি। তবে বছর দুই ধরে ওর নিজের লেখার সংখ্যা কমে এসেছিল। সেটা হতে পারে ওর অনীহা বা সাংসারিক চাপ। আসলে কবিকেও যে বাজার করতে হয় এটা আমরা ভুলে যাই!
 
বিবেকের বিশাল বপুর পেছনে যে একটা নিষ্পাপ শিশু মন লুকিয়ে তা যেন বেশি করে টের পেলাম যখন প্রয়াত লক্ষ্মী নন্দী কোভিড পজিটিভ হয়ে শিলিগুড়িতে ভর্তি। যতদূর জানি, বিবেকের বাড়ি থেকে নার্সিং হোমের সেই ঘরের জানালাটা দেখা যেত, যে ঘরে লক্ষ্মীদি ভর্তি ছিলেন। সেই সময় বিবেকের ফোন মানেই উৎকণ্ঠিত কান্না ভেজা গলা আর ঈশ্বরের কাছে লক্ষ্মীদির সুস্থতা কামনা করে প্রার্থনা করবার কাতর অনুরোধ। আর ১লা নভেম্বর যেদিন লক্ষ্মীদি চলে গেলেন, সেদিন ফোনে হাউহাউ করে বিবেকের কান্না আমি জীবনে ভুলব না। একজন অনাত্মীয় মানুষকে কতটা আপন করলে ওরকমভাবে কাঁদা যায়, সেটা কল্পনা করাও যায় না। সত্যিই লক্ষ্মীদির ভাই ছিল বিবেক। তাই বোধহয় খুব তাড়াতাড়ি চলে গেল দিদির কাছে!

আর এক অর্থেও যেন বিবেক লক্ষ্মীদির ভাই ছিল। লক্ষ্মীদি একটা কথা বলতেন- 'ডান হাত দেবে, বাঁ হাত জানবে না। যদি এরকম হয় তবেই কাউকে আসল উপকার করা হয়।` আমার কাছে যতদূর তথ্য আছে তাতে জানি যে, নিজের সীমিত স্বার্থের মধ্যেও বিবেক বহু মানুষকে সাহায্য করে গেছে এবং তার জন্য কোনও প্রচার করেনি। এই প্রচার সর্বস্বতার যুগে যেখানে সামান্য সাহায্যও সমাজ-মাধ্যমের বা কাগজের খবর হয়, সেখানে বিবেকের এই নির্বাক-নিশ্চুপ সাহায্য যে কী তা বলে বোঝানো যায় না। এখানেও বিবেক ব্যতিক্রম। 

নিজের সঙ্গে সঙ্গে, অন্যের ছবি তোলা ও সবাইকে দেখানোর একটা অদ্ভুত নেশা ছিল বিবেকের। চলে যাওয়ার মাত্র পাঁচ/ছয়দিন আগেও নিজের পঁচিশ বছর বয়সের একটি ছবি পোস্ট করেছিল। কমেন্টে লিখলাম, 'তুমি আমার কাছে সবসময় পঁচিশ বছরেরই থাকবে।` চুপচাপ মেনে নিল। বড়দের জন্য সম্মান-শ্রদ্ধা ছিল ওর সহজাত। কোনোদিন কারও সম্পর্কে একটিও বিরূপ কথা শুনিনি ওর মুখে। ওর চোখে পৃথিবী সবাই ভাল। আসলে ও নিজে ভাল বলেই সবাইকে ভাল দেখতো। এরকম মানুষ পৃথিবীতে যত থাকবেন, সমাজের তত মঙ্গল। এদের চলে যাওয়া মানে সবার ক্ষতি। বিবেকের অনুপস্থিতি আমাদের সেই ক্ষতির সামনে দাঁড় করিয়েছে, যা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়।     

কবি বা লেখক বা সম্পাদক-সংগঠক হিসেবে বিবেক কবিরাজের ‌‌মূল্যায়ন করবে ভবিষ্যত। আমি যেটা করতে পারি সেটি কেবল স্মৃতিচারণ। তিনবিঘা, শিলিগুড়ি, কোচবিহার সব মিলে বিবেকের সঙ্গে কম স্মৃতি নেই। কিন্তু সেসব একেবারেই ব্যক্তিগত। তবে ওই ব্যক্তিগত মেলামেশার সূত্রেই মানুষ বিবেককে চেনা ও জানা। আর তাতেই বুঝেছি যে, মানুষ বিবেক অতুলনীয়। বিবেক মানেই একের পর এক আঘাতেও ভেঙে না পড়া এক অদম্য শক্তি। কীরকম হাসতে হাসতে মেডিক্যাল কলেজে গেল অক্সিজেন নিতে। ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দিল না যে, কতটা অসুস্থ ও! মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় শরীরের এতটা খারাপ অবস্থা হবে সেটি আর ভেবেছিল! ওর চলে যাওয়া তাই বড্ড বেশি আকস্মিক, বড্ড বেশি কষ্টের যা কিছুতেই মানা যায় না।

তবু মানতে হচ্ছে। বিকল্প তো আর কিছু নেই! এপ্রিল ২০২০ থেকে এখনও অবধি ব্যক্তিগত জীবনে নিজের মা, দাদা রঞ্জন ভট্টাচার্য ও নিজের বাবা কে হারিয়েছি। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে রইবার এই সময়ে ভাই বিবেকের চলে যাওয়া একেবারেই এলোমেলো করে দিয়ে গেল, ভেঙে দিয়ে গেল সবকিছু!!




বিবেককে যেভাবে দেখেছি .....
              চম্পা ভট্টাচার্য্য

চোখে ভাসছে সেই ছিপছিপে মিষ্টি ছেলেটার ছবি ..নব্বই দশকের মাঝামাঝি হবে তখন থেকেই বিবেককে দেখেছি নাটকে খুব উৎসাহ ছিল , খুব সম্ভবত দামামার  সঙ্গে যুক্ত ছিল । আমার সব নাটক দেখতে আসতো নাটক শেষে গ্রিন রুমে এসে দেখা করতো এই ভাবেই ওর সাথে দিদি ভাইয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি । এরপর ও সাহিত্য জগতে ঢুকে গেল , খুব ভালো কবিতা লিখতো ...সাহিত্য অঙ্গনে কর্ণধার ছিল ..একজন ভালো সংগঠক ছিল।  একসময় আমি খুব মানসিক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন আমাকে জোর করে সাহিত্য অঙ্গনে নিয়ে গেল ওর প্রিয় সংগঠন । আমাকে দিয়ে জোর করে লেখা বের করে নিত ...সাহিত্য অঙ্গনের সভাপতি করল , সাথে করে কত সাহিত্য সম্মেলনে নিয়ে গিয়েছে ..কি করে এত সব ভুলে যাব ! মধুর ব্যবহারের জন্য সবার কাছে ভালোবাসার পাত্র ছিল ..এই বয়সে আমাদেরকে ছেড়ে কিভাবে চলে গেল এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না ..বুকটা জুড়ে শুধু হাহাকার ..চোখ জলে ভরে আসছে । আর কিছু লিখতে পারছি না ।



আমার ছোট ভাই ছিল বিবেক ....

          নিশিকান্ত সিনহা।

যে কোনো মৃত্যুই বেদনাদায়ক ৷ যদি সেই মৃত্যু প্রিয় মানুষের হয় তখন তো বিষন্ন দীর্ঘশ্বাস  চেপে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে ...বিষাদে ভরে ওঠে বুক !
      বিবেক কবিরাজ আমার ছোটো ভাইয়ের মতো ছিল ৷ ছিল আমার স্নেহধন্য ৷ তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে আমি হতবাক ! মাত্র ৪৯ বছর বয়ছে ছেড়ে চলে গেল ...! আর কোনোদিন ওর আবেগ ও আন্তরিক আহ্বান শুনতে পাবো না - সব সময়ই ফোন করে বলতো সাহিত্য অঙ্গনের  অনুষ্ঠান...আপনাকে আসতে হবে এবং সঙ্গে কয়েকজন কে নিয়ে আসবেন...
আমি যতবার গিয়েছি ততবারই সম্মানের আসন দিয়েছে...বাধা দিলে আকুল গলায় উত্তর পেয়েছি...দাদা, আপনি আমাকে ইসলামপুরে পরিচিত করিয়েছেন..আপনার উৎসাহে এই পত্রিকা ও অনুষ্ঠান করা..! 
    ২৫ ডিসেম্বর ২০০৯ শিলিগুড়ির ' বসুন্ধরা 'য় ' উ.ব.নাট্য জগৎ 'সাহিত্য অনুষ্ঠানে বিবেক কবিরাজ  ও কান্তা দাসের সাথে প্রথম আলাপ পরিচয় ! ইসলামপুর থানার অধীন জগতাগাঁও স্কুল, মাটিকুন্ডা পঞ্চায়েত লাইব্রেরী আয়োজিত ২০১০ এর বর্ষবরণ (১লা জানুয়ারী ) অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাই ! ওরা ২জন এসেছিল ...সেই থেকে যাওয়া আসা আর পরিচিতি আরো সুদৃঢ় হয়....
      অনেক কথা, অনেক স্মৃতি বুকের ভেতর জমা আছে ! আমার বাড়িতে যেমন এসেছে আমিও তেমনভাবে তার ফ্ল্যাটে গিয়েছি ...! 
   ঈশ্বরের কাছে বিবেকের আত্মার চির শান্তি কামনা করি এবং বৌমার জন্য সমবেদনা জানাই ! আমরা ইসলামপুরের কবি, লেখক ও সহমর্মী মানুষজন  তাঁর পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করছি  !


কিছু চলে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না!
সুবীর সরকার


১.
একথা আমি বিশ্বাস করি না যে বিবেক নেই!
এই তো সেদিন লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় আড্ডায় মাতলাম!বিবেক হেঁটে গেল মেলা গেটের দিকে।আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম।তবে কি সে চিরতর কোন কুয়াশার দিকে রওনা হয়েছিল!
বিবেক কবিরাজ।আমার অনুজ।
কবিতা,অনুগল্প,নাটক,ব্যাক্তিগত গদ্য এমন নানান লেখালেখি তাকে জড়িয়ে রাখতো।
বিবেক ছিল একজন দক্ষ সম্পাদক।অভাব,দারিদ্র্য,কোন প্রতিবন্ধকতায় আটকে থাকেনি সে।
সম্পাদনা করতো সাহিত্য অঙ্গন আর জলপিপি নামে দুটি পত্রিকা।
২.
খুব সহজ ছিল বিবেক।কত উপেক্ষা তাড়া করেছে তাকে।কিন্তু সে উদাসীন।নিজের স্বপ্ন আর কাজ নিয়েই ব্যস্ত রাখতো নিজেকে।
মাঝে মাঝে গভীর রাতে আমাদের দূরভাসে কথা হতো।নানারকম পরিকল্পনা নিয়ে বিবেক কত কিছু বলতো।
সেই ২০০৪ এ মেখলিগঞ্জের লক্ষী নন্দীর

বাসায় আমাদের পরিচয়!এভাবে শেষ হয়ে যাবে সব ভাবিনি কখনো।
৩.
বিবেক খুব উদাসীন ছিলো। সে নিজেকে পীড়ন করতো।দগ্ধ করতো।বিবেকের ভেতর দাউদাউ কবিতা ছিল।কিন্তু নিজের এবং নিজের লেখার যত্ন নেয় নি সে।
আমি বারবার তাকে বলতাম _"নিজেকে গোছাও ভাই"।
এই চলে যাওয়া অদ্ভুত শূন্য করে দেয়।চূড়ান্ত অসহায় করে দেয়।
খুব ফাঁকা হয়ে পড়ি আমরা।
বিবেক থাকবে,আমাদের বুকের খুব গহিনেই।


অন্ধকারে যারা চলে যায় তারা বেঁচে যায় ...

ভজন বিশ্বাস -

এভাবে কি চলে যায়  এই যে চোখে হারাই। বরাবরই দূরত্ব রাখা ছিলো । অথচ অঙ্গন জুড়ে সাহিত্য আর এখন ভীষণ রকম নীল । অভিমান হতে ইচ্ছে হয় । এত তাড়াছিল । কেনো ? 
কিসের ? 

খুব অন্ধকার ! ভাঁজে ভাঁজে প্রথম দিনের স্পর্শ । কথা বলি । যে দশ অঙ্কের নাম্বারের মধ্য দিয়ে  কবিতা রোদ্দুর শোনাতে ,  ভেজা হবেনা আর ।

       জানি এভাবে কাঁধে হাত রাখবেনা। জানতে চাইবে না ব্যাথা । 
                এ ব্যথা যে অসহনীয় । একটা খাঁ খাঁ । শূন্যতা । না  পারা । অবিশ্বাস্য। কষ্ট। 
                           সেদিন উঃ ব. সাহিত্য আকাদেমি আয়োজিত মেলায় দেখা মাত্র 'পুরুষ' নামক সংস্থার সদস্য হোওয়ার পরামর্শ দিলে। ফোন নাম্বার নিয়ে পরে যোগাযোগ করে নেবো- জানালাম। তারপর ছোট্ট আড্ড। আড্ডায় তোমার শতাব্দী এক্সপ্রেষে চেপে পৌঁছে যাই  সাহিত্য অঙ্গনের প্রথম আসরে । এই আসরেই শুনিয়েছিলে প্রথম । গল্পটি আজো সমাদৃত । "বোকা শালা" শ্রুতি নাটক (  সঠিক নাম মনে পড়ছেনা) আজো মনে করে একা একাই হাসি । 
      এভাবেই কি হাসাতে হাসাতে ----- 

বিবেক দা !

খুব বেশি তাড়া হয়ে গেলো না ?

বিবেকদা ....

     শ্যামলী দাস -

মার্কেটে যাওয়া আসার পথে মাঝে মাঝেই ঢুকতাম বিবেকদার দোকানে। একদিন যেতেই বলল, শ্যামলীদি এই হোয়াটস অ্যাপ নম্বরটাতে আপনার লেখা একটা কবিতা পাঠান তো। এফ এম এর এই চ্যানেলটায় এখন কবিতা পাঠ হচ্ছে। বিবেকদার কথায় ফেসবুকে পোস্ট হওয়া একটা কবিতা কপি পেস্ট করে সেই হোয়াটস অ্যাপ নম্বরে পাঠালাম। আর পরক্ষণেই এফ এম চ্যানেলে আমার লেখা কবিতাটার পাঠ শুনলাম। 
      আরেকদিন দোকানে যেতেই বলল, একটু আগে আসতে পারলেননা শ্যামলীদি। এক্ষুনি সিসিএন টিভি চ্যানেল থেকে দুজন এসেছিল , আমি স্বরচিত কবিতাপাঠ করলাম সরাসরি সম্প্রচার করল। দেখুন গিফ্টও দিল। আমি কিছু বলার আগেই দোকান থেকে বেরিয়ে দেখে এসে বলল, শ্যামলীদি ওরা আছে, যায়নি এখনো। আসুন। আমাকে তাদের সামনে পাঠানো হল। আমার লেখা কবিতাও শোনানো হল। হল সরাসরি সম্প্রচার। আর মিলল একটা সুন্দর গিফ্ট। 
     এই রকমই ছিল বিবেকদা। সব অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য বলতো , আবার আমাদের ঘোড়সওয়ার এর সাহিত্য বাসরেতো আসতোই । 



বেঁচে রবে বিবেক কবিরাজ

                     রাজ পথিক , বাংলাদেশ

শেষ বার্তাটি ছিল, অক্সিজেন লেভেল কমতি
সেই কমতি শূন্যে যাবে, বলেনি নিষ্ঠুর নিয়তি!
তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিল যারা,
তাদের শান্তনা কী বলো দাদা, তোমাকে ছাড়া?
প্রিয় কবি ছিলে তুমি বিবেক কবিরাজ,
প্রগতিশীল চেতনায়, আর মননে মহারাজ।
তোমার এই দ্রুত প্রস্থান চলে যাওয়া নয়,
তোমার নিহিত সৃষ্টিগুণ, মৃত্যুকে করেছে জয়।
হয়তো তুমি জ্বলবে মিটি আকাশের তারা হয়ে,
তোমার সৃষ্টিকর্ম তবু প্রজন্ম বেড়াবে বয়ে।
লুকাও যতোই অন্তরালে, থাকবে অকপটে
বিবেক কবিরাজ বেঁচে রবে সকলের হৃদয়তটে।



বিবেক কবিরাজ একটি বটগাছের ছায়ার নাম
             অজিত কুমার বর্মণ

হ‍্যাঁ, বিবেক কবিরাজ একটি বটগাছের ছায়ার নাম। যে ছায়ায় এসে আশ্রয় নিয়েছে আমার মতো অনেকে। যেখানে চারিদিকে আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থানেষি  মানুষের ভীড়ে সমাজ পরিপূর্ণ হয়ে গেছে সেখানে বিবেকদার মতো কতিপয় মানুষ বটগাছের ছায়ার মতো শীতলতা দিয়ে কিছু দিকভ্রষ্ট, ক্লান্ত, অবসন্ন পথিককে পথ দেখিয়ে দেয়। সঙ্গ দেয় পথকে মসৃণ করতে, অনুপ্রাণিত করে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাতে। ২০০৯ সালে প্রথম সাক্ষাৎ তোমার সাথে। সেও এক বর্ষণমূখর সন্ধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের মাসিক সাহিত্য বাসরে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে সম্পর্কের গভীরতা বাড়তে থাকে। আমাদেরকে নিয়েই তো সাহিত্য অঙ্গন গড়ে উঠেছিলো। তারপর থেকে তোমার সাথে কোথায় যাইনি বলতো?  অভিভাবক হয়ে গাইড করেছো, বন্ধু হয়ে পাশে থেকেছো, দাদা হয়ে স্নেহাশীষ করেছো। তোমার সাথে ঘুরতে ঘুরতে অনেকের সাহচর্যে আসতে পেরেছি, কত কিছু শিখতে পেরেছি, জানতে পেরেছি। আজ সবকিছুই আছে শুধু তুমি নেই। 

এইতো কদিন আগেই তোমার দোকানে অনেক গল্প করলাম, ভালো মন্দ আলোচনা করলাম, সাহিত্য অঙ্গন পত্রিকা আবার বের করার পরিকল্পনাও করলাম। আমাদের স্বপ্নগুলো স্বপ্নই থেকে গেলো, তুমি ছাড়া সেটা বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন। অভিভাবকহীন হয়ে গেলাম। আর কোনদিন দেখা হবেনা, তোমার দোকানে আড্ডা দেওয়াও হবেনা। 

আচ্ছা, মানুষের মৃত‍্যু কেনো হয় বিবেকদা? যে মৃত‍্যু অন‍্যদেরকেও কাঁদায়, অনুভূতি শুন‍্য করে দেয়। 

ভালো থেকো দাদা। 




বিবেকদা....
বিকাশ দাস  (বিল্টু )

                      বিবেকদা তোমার সাথে আমার পরিচয়টা মনে আছে নিশ্চয়ই। আমার পত্রিকার প্রথম প্রকাশ অনুষ্ঠানে তোমায় আমন্ত্রণ জানানো, সেদিনই তোমার সাথে আমার প্রথম ফোনালাপ। তুমি চমকে গিয়েছিলে। সে দু'বছর আগের কথা। এরপরে মহানন্দা-মানসাইয়ে বয়েছে কত জল। নিবিড় হয়েছি আমরা এক অপরের কাছে। কতটা আপন হয়েছি তোমার কাছে সে আপনি থেকে তুমি, তুমি থেকে তুই ডাক'ই জানে। কত ফোন, কত কথায় আমরা ভালোবাসা মাখামাখি করেছি গায়, মনে আছে বিবেকদা নিশ্চয়ই তোমার।

                    এইতো বেশ কিছুদিন আগে ' উত্তরবঙ্গ সাহিত্য আকাদেমি ' আয়োজিত লিটল ম্যাগাজিন মেলায় আমরা কত আড্ডা, খুনসুটিতে মজলাম। তুমি আমায় আমার টিউশন জীবনের বদলে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বললে। এযাবৎ সবই ঠিক ছিল। ঠিক ছিলনা তোমার অকালে চলে যাওয়া। তুমি চলে গেলে বিবেকদা না ফেরার দেশে। আর কে বলবে ' বিল্টু শিলিগুড়িতে তোর এক দাদা আছে....'

স্মৃতি ....
             অনিমেষ সরকার

বিবেকদার সাথে যখন প্রথম আলাপ তখন সদ্য লিখতে এসেছি ।২০১৭-এর শেষের দিকে।সোশ্যাল মিডিয়ার দরুন আলাপ জমে উঠলো প্রাণোচ্ছল ,সদা।হাসিমুখের মানুষটার সাথে।মাঝেমধ্যে কথা হতো ম্যাসেঞ্জার এ।নতুনদের প্রতি বড্ড কেয়ারিং ছিল বিবেকদা।।আমার মনে হতো মানুষটা অন্য ধাঁচের।প্রথম যখন সরাসরি সাক্ষাৎ হলো।তখন তার পা সবে ঠিক হচ্ছে।আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের এক কপি সই সহ কিনে নেন বিবেকদা।সেদিন যেমন আনন্দ হচ্ছিল তেমনই একটা ভালো লাগা কাজ করছিল। বিবেকদার সাথে এরপর আলাপ বইমেলায়।তরুণদের সাথে সবসময় যিনি একদম ফিট। দেখা হলো আড্ডা হতো ,কত মজা হতো একসাথে দেখা হলে। অপরদিকে বিবেকদার কিছু লেখা ভালো লাগতো।তাই খুঁজে খুঁজে পড়েছি মাঝেমধ্যেই। উত্তরবঙ্গ সাহিত্য আকাদেমি গঠন হবার পর আরও বেশী মজবুত হয়  সম্পর্কটা। প্রেস কনফারেন্স এর দিন হোক বা লিটল ম্যাগাজিন মেলা।বিবেকদা একদম তৈরী থাকতো।পায়ের অপারেশন এর আগের দিন কথা হয়েছিল।দেখলাম অদম্য জেদ আর মনের শক্তি মানুষটার।তারপরে শেষ দেখা বিবেকদার দোকানে।আমি তন্ময়দা আর শৌভিকদা অনেকক্ষণ তাঁর দোকানে বসে আড্ডা মেরেছি।আলোচনা করেছি অনেক বিষয়।তখনও বিবেকদার পাশে বসে কত ইয়ার্কি হাসি ঠাট্টা হলো।লিটল ম্যাগাজিন মেলাতেও খোঁড়াতে খোঁড়াতে এলো,বললাম"চলো, কোল্ড ড্রিঙ্ক খাই"।কোনো কথা নেই হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল পাশের এক দোকানে। এই মানুষটা এমনই ছিল।কখনও গম্ভীর দেখিনি।যখনই দেখা হয়েছে তখনই হাসি মজা করে সময় কাটিয়েছে।আর একটা গুন ছিল দাদা দেখা হলেই জড়িয়ে ধরতো।এখনো অনুভব করতে পারি, অনিমেষ বলে জড়িয়ে ধরা, তারপর কাঁধে হাত রেখে কথা বলা।বিবেকদার সম্পর্কে স্বল্প পরিসরে অনেক কিছুই বলা যাবে না।এখানে বলছিও না।স্বল্প কথায় ,সেদিন যখন বিবেকদার বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার ৪মিনিট পর মুজনাই সম্পাদক কবি,গদ্যকার শৌভিক রায় লিখলেন "বিবেক আর নেই" কিছু বলার বা বোঝার মতো ভাষা হারিয়ে ফেলি।আর মানুষটার সাথে কথা হবে না!আর কখনও দেখা হলে বলবে না'"আমার থেকে বেশী ফুলে যাচ্ছিস, কমা কমা একটু কমা", অন্যদের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়ে ভরাতে পারিনি। কী হারিয়েছি কতটা হারালাম বোঝানো যাবে না।তবুও যখন তার হোয়াটসাপ নম্বরটা যখন দেখি হোয়াটসাপ স্ট্যাটাস  সিন করেছে বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে । বিবেকদা! বিবেকদা আমাদের মধ্যেই আছেন ,শুধু শরীর বিলীন হয়েছে এই যা, এটাই বিশ্বাস করি মনেপ্রাণে ...

ঊনিশে মে‌ ভাষা শহিদ দিবসে পথনাটকে বিবেকদা ... রাজার চরিত্রে।

ভালো থেকো....
           সুদীপ চৌধুরী

ভাবিনি কোনোদিন চলে যাবে তুমি এভাবে।  সুদীর্ঘ পরিচয়ের সমাপ্তি ঘোষণা করলে কেন এভাবে?  "সাহিত্য অঙ্গণ" এর জন্ম লগ্ন থেকে আমার তোমার বন্ধন ছিল দৃঢ়। কত ঝড়-ঝাপটা গিয়েছে "সাহিত্য অঙ্গণ" এর উপর দিয়ে। আমি ও তুমি তখনও ছিলেম অবিচল। মনে পড়ে "জলপিপি" র জন্মলগ্নের কথা। আজও "সাহিত্য অঙ্গন" এর প্রথম প্রকাশিত পত্রিকা আমার কাছে আছে। "সাহিত্য অঙ্গন"এর পক্ষ থেকে কতটা গুণী জনকে আমরা সম্মানীত করেছি। আর এই সাহিত্য অঙ্গনের মাধ্যমেই উঠে এসেছে একটা ঝাঁক কবি সাহিত্যিক।  তুমিই তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছ শিলিগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গের সাহিত্য জগতের সাথে। এ কথা আমি জানি।  
তোমার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি বিবেক।  যেখানেই থাক ভালো থেক।


   মুগ্ধ হয়ে যাই

            সুব্রত রায় চৌধুরী


সেদিনের কথা খুব মনে পড়ে। দুহাজার সতেরোর এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় ভাতৃপ্রতীম কবি শুভ্রদীপের আমন্ত্রণে উপস্থিত হয়েছিলাম ' লহরী' পত্রিকার এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। 

মাঝারি একটা ঘরে একঝাঁক শিল্পীর মিলনমেলা সেখানে। কবি, বাচিকশিল্পী ও অন্যান্য অনেক স্বনামধন্য গুণীজনের মেলা। সেখানে, একপাশে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন তিনি, সকলের প্রিয় কবি বিবেকদা। আলাপ হল ওঁর সঙ্গে। নাম জানলাম। উনিই স্বনামধন্য বিবেক কবিরাজ। অবাক হয়ে দেখলাম ওঁকে। ভারি শরীরে, দুটো মায়াময় নিশ্চুপ কথামালায় ভরা একজোড়া চোখের মালিক আমাদের বিবেকদা!

দেখলাম ওঁকে। শুনলাম ওঁর ধীর গম্ভীর গলায়, ওঁরই রচিত কবিতার লাইন। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সেই লাইনগুলো কত গভীর! কী দ্যোতনাময়! কী গভীর আকুতি সেই লেখায়! 

পরের বছর , অর্থাৎ দু হাজার আঠারোর জুন। আমাদের সকলের প্রিয় পত্রিকা ' ঘোড়সওয়ার' এর সম্পাদক, মাননীয় নীহারদার আমন্ত্রণে উপস্থিত হয়েছিলাম শিলিগুড়ি ভিবজিওর ক্লাব প্রাঙ্গণে। ' ঘোড়সওয়ার' পত্রিকার পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে। সেখানে আবার দেখা হল ওঁর সাথে। শুনলাম ওঁর গভীর গলায়, ওঁর সৃষ্টির ডালি। মুগ্ধ হলাম আবার। 

তারপর পরিচয় গভীর হয়েছে দিনে দিনে। যখনই দেখা হত, ওঁর গলায়, ' সুব্রতদা' ডাকে মোহিত হতাম বারবার। ওঁর দোকানে বসে অনুরোধ করতাম মাঝে মাঝেই, " দাদা, কিছু শোনান না"। না করতেন না কখনো। উনি পড়তেন কবিতা। শুনতাম মুগ্ধ হয়ে। দেখতাম কবিতা কখন যেন ধরেছে রূপ, ফিরছে ঘুরে ঘুরে। ওঁর আশেপাশে। নিরালায়। বলতাম নিরুচ্চারে, " দাদা। মুগ্ধ হয়ে যাই।"

ঘোড়সওয়ার পত্রিকার ঘরোয়া অনুষ্ঠানে, নীহারদার ডাকে গেছি অনেকবার। দাদা আসতেন। বসতেন। সেখানে। সকলে মিলে শুনতাম তাঁর সৃষ্টি। চুপচাপ।  বলতাম মনে মনে, " দাদা। মুগ্ধ হয়ে যাই।"

আজ তিনি নেই। তবু ভাবি, তিনি আছেন। তাঁর ছবি আছে, তাঁর অমর সৃষ্টি আছে , তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধ আছেন। আর আছে কানে কানে ওঁর নরম স্বর, " সুব্রতদা, কেমন আছেন?"

ভালো থাকুন বিবেকদা। জানি আপনি আছেন সবসময়ই, আপনার সৃষ্টিতে, আপনার দৃষ্টিতে। আপনার অপার ভালোবাসার ডালি নিয়ে। সেই ডালিতে এখনো যাচ্ছে মিশে, আপনার সেই সাঁঝবেলার মূর্ত কবিতার আবিল পঙক্তিগুলি।


বিবেক ভাই 
             সজল গুহ 

বয়সে আমার থেকে অনেক, ছোট সদ্য প্রয়াত কবি, বিবেক কবিরাজ সমন্ধে আমাকে কিছু লিখতে হবে ভাবিনি, গত সাত বছরের বেশী সময় ধরে ওঁর সঙ্গে পরিচয় ও হৃদ্যতা। "সাহিত্য অঙ্গনে"র কর্ণধার কবি লেখক, সংগঠক, সদাহাস্য,রসিক ও আরও গুণে গুণান্বিত বিবেক করোনার এই অতিমারীতে এভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যাবে ভাবিনি  কখনো । বিবেক মানে একটা প্রতিষ্ঠান,অমায়িক ব্যবহার, হৃদ্যতা, সবাইকে নিয়ে চলা। বিবেক মানে শুধু শিলিগুড়ি উত্তরবঙ্গ নয় সারা পশ্চিমবঙ্গ ব্যাপী তাঁর ব্যাপ্তি সাহিত্য জগতে। ওঁর হাত ধরে শিলিগুড়ি ও আশেপাশের অনেকেই সাহিত্য জগতে প্রবেশ করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
আর্থিক অসচ্ছলতা, শারীরিক সমস্যা সত্ত্বেও বিবেক ভাই কাজ চালিয়ে যেতো।গত মার্চে শিলিগুড়ি লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় ওঁর সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎকার,এর আগে ২৩ জানুয়ারী নেতাজীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমার বাড়ী আসে, অনেক সময় ধরে কথা হয় ওঁর সঙ্গে। সবার কাছে অনুরোধ, আসুন ওঁর পরিবারের পাশে দাঁড়াই বিশেষ করে আর্থিকভাবে।

তোমার স্মৃতিতে 
               
             মৌমিতা  মোদক 

কিভাবে গেলে চলে?
থোকা থোকা কবিতা আর
অগনিত পাঠক ফেলে ?

জানো কি,
 আমাদের মাঝে আছো , থাকবে
বিচরণে কবিতার আকাশে হেসে খেলে,
ছেড়ে আমাদের যেতে তুমি তো পারো নি !

পারো নি তাই নিভতে চিতার আগুনে জ্বলে।



ভালো থেকো দাদা
              
            নীল নীল ( নেপাল থেকে )

আজ পৃথিবী অসুস্থ 
তারি মাঝে বেঁচে থাকার লড়াই
কেউ থাকে কেউ বা চলে যায়  
এরি মাঝে কিছু মানুষ আপন রয়  ।
হারিয়েছি আমিও আপন গুরুজন  ,
তিনি সময়ে অসময়ে পাশে ছিলেন সর্বক্ষণ  । সাহস যোগাতেন অনুপ্রেরণার গল্প শুনাতেন , ভালোবাসার মানুষ ছিলেন তিনি । বিবেক দাদা  এভাবে চলে যাবে কখনো ভাবিনি , ভালো থেকো দাদা  ।


তুমি চলে গেলে 
      কাজী পরাগ ( বাংলাদেশ )
শুধু
"অক্সিজেন লেবেল কমে যাচ্ছে,
চললাম হাসপাতালে,
বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে"।
দেখা হলোনা দাদা,
বিষাদের নোনা জলে ভাসিয়ে তুমি চলে গেলে অনন্ত যাত্রায়, তুমি চলে গেলে অপরিণত জীবনের সমাপ্তি রেখায়,
তুমি চলে গেলে দূর থেকে বহু দূরে , ধ্রুব তারার মত এক খন্ড আলোক রশ্মি হয়ে,
তুমি চলে গেলে বেদনাহত জীবনের অমানিশার সমাপ্তি টেনে। দেখা হলোনা তোমার, করোনা মুক্ত সুস্থ‍্য,  স্নিগ্ধ সতেজ সকাল, দেখা হলোনা খুনসুটিময় ভালোবাসায়
ভরা একটি  বিকেল,
তুমি চলে গেলে বিবেক দাদা .....

                         

" পড়ে থাক মনের বোঝা ঘরের দ্বারে ..."
         ‌নীহার রঞ্জন দাস

ফেবুতে বিবেকদার সাথে বন্ধুত্ব ছিল অনেক দিনের। ২০১৭তে আমি শিলিগুড়ি আসার পর একদিন কবি , ও সম্পাদক শ্যামলী দাসের সাথে আমন্ত্রিত হয়ে গেলাম সাহিত্য অঙ্গনের সাহিত্য আসরে , প্রেস ক্লাবে । আসর শেষ হবার পর বিবেকদার সাথে অনেক আলাপ হলো , সেই থেকেই শুরু হলো একটা নিবিড় টান। তাঁর আব্দার থেকেই শুরু করলাম ঘোড়সওয়ার এর মাসিক সাহিত্য আসর । শুরু হলো আমাকে নিয়ে বিভিন্ন সাহিত্য আসরে  যাওয়া ।  আজ আমি উত্তরবঙ্গে যাদের কাছে পরিচিত হয়েছি তার মূলে শ্যামলী দাসের ভুমিকা অবশ্যই আছে কিন্তু বিবেকদার ভুমিকা এতোটাই ছিল যে তা অনস্বীকার্য । যখন যেখানে যাবে ফোন করেই বলতো নীহার দা চলে আসুন, উপেক্ষা করব যে তার সাহস ছিল না, এত আন্তরিক যার ডাক , শুধু সাহিত্যের ক্ষেত্রে নয় , আমি যেন ছিলাম বিবেকদার এক চরম বিশ্বাসের জায়গায়, মেঘ যদি স্যারের বাড়ি যেতনা , যদি সারাদিন মোবাইলে ডুবে থাকতো , আমাকে ফোন করে বলতো একটু আসুন তো নীহার দা , আমি যেতাম , বকতাম , আমার বকা শুনে বৌদি ও বলতো আপনি ওকে পড়াবেন, আপনাকেই ভয় পায়। মেঘকে বকতাম তাইবলে কোনো দিন রাগ করতে দেখিনি বিবেকদাকে । 
খেতে ভালোবাসতো খুব, আমাকে বলতো নীহার দার হাতের খাবার না খেলে জানতাম না এতো ভালো রান্না করা যায়, নীহার দা আপনার হাতে রান্না করে একদিন খাওয়াবেন, এত আব্দার করে বললে না করতেতো পারিনা, একদিন রাতে নিমন্ত্রণ করলাম, শনিবারে নিরামিষ খেতো, আমার বানানো পদ খেয়ে কতজনকে যে ফোন করে জানিয়েছে । এবার জানুয়ারিতে আমাদের ঘোড়সওয়ার এর বার্ষিক অনুষ্ঠান করব কিন্তু কোভিডের জন্য কোনো হল পাওয়া যাচ্ছে না , কথা শুনেই বলে দিল কেন চিন্তা কিসের নীহার দা , আমার ছাদে হবে , ঘোড়সওয়ার এর অনুষ্ঠান হবেনা এটা হয় ? এইভাবে মানুষটা সব সময় এক ডাকে সাড়া দিত। কোথাও যেতে গেলে যদি ট্রেনের টিকিটের প্রয়োজন হত একটা ফোন করার সঙ্গে সঙ্গেই দেখে সব জানিয়ে দিত । আমরা যাব দার্জিলিং ঘুরতে গাড়ি পাচ্ছি কিন্তু অনেক ভাড়া চাইছে , বিবেকদাকে বলার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ঠিক করে দিল , অনুষ্ঠানের জন্য মেমেন্টো কিনবে সেই আমি ছাড়া যাবেনা , বাংলাপক্ষের মিছিল আমি ছাড়া যাবেনা। সব কিছুতে আমার নাম ঢুকিয়ে তারপর ফোন করে বলতো , আপনার ওখানে যেতে হবে আমি আপনার নাম নাম দিয়ে দিয়েছি । একটা ছেলের চাকরির জন্য একবার শুধু বলেছিলাম, বিবেকদা সেই ছেলেটাকে পরের দিন ই চাকরি পাইয়ে দেয় । 
কবিতা , সাহিত্য সংস্কৃতি করতে গেলে আমাদের যে সামাজিক আরো দায়ভার থাকে সেটা বিবেকদার ছিল এবং ছিল বলেই এতো ভালোবাসা পেত মানুষের কাছ থেকে। পথ নাটক হবে , বিবেকদাকে বললাম কাকে বলে বলব, সঙ্গে সঙ্গে নাম বলে দিল, কাকলীদি , মানসীদি , মৌটুসী , রিহার্সেল কোথায় দেব , তাও বলে দিল নীহার দা , আমার ছাদে হবে । যেদিন চলে যায় তার আগের দিন রাতে বললো , নীহার দা , চাকরি টা পা য়ের জন্য করতে পারলাম না , দোকানটা ঝুলে গেছে একটা বুদ্ধি দিন, আপনি দায়িত্ব নিন। আধা ঘন্টা আলাপ হলো , লকডাউন শেষে আমরা শুরু করবো। 
এতটাই টান ছিল কেন যে চলে গেল আমাকে একা রেখে , শেষ মিটিঙে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া, শেষ কবিতা ঘোড়সওয়ারে দেওয়া , শেষ কবিতা পাঠ আমার ক্যামেরায় বন্দী। আমাদের উত্তরবঙ্গ সাহিত্য একাদেমির লিটল ম্যাগাজিন মেলা র শেষ রাতে ম্যাগাজিনের পুরো ব্যাগটাই আমার কাছে দিয়ে বলল আপনার কাছে থাক , পরে নেব ।
কত লিখবো , বিবেকদাকে নিয়ে আমি লিখবো এমনতো কথা ছিল না ,  সেতো চলে গেল , অমৃতলোকে আমাদের রেখে ....


1 comment:

  1. কোন দিন যে বিবেক ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে হবে ভাবি নি , ভাবি নি কোনদিন এই বয়সে আমাদেরকে রেখে দিয়ে ও চলে যাবে অমৃতলোকে । প্রায় তিরিশ বছর ধরে ওর সাথে পরিচয় কত স্মৃতি কত গল্প জমা আছে বুকের গভীরে ..ওর শিশুর মত সারল্য খুব তাড়াতাড়ি আমাদেরকে দিদি ভাইয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে ফেলল ...নানারকম অসুখে এই বয়সেই খুব কষ্ট পাচ্ছিল আনেক কিছু খাওয়া নিষেধ ছিল কিন্তু খেতে খুব ভালোবাসতো ...বাড়িতে এলে বলবে দিদি মিষ্টি খাব ..সিঙ্গারা খাবো আর বাসুদা গিয়ে গরম সিঙ্গারা নিয়ে আসত ...এমন ছেলে মানুষ ছিল । নিজের প্রতি সংসারের প্রতি খুব উদাসীন ছিল ...মাঝে একদিন বলল দিদি সাহিত্য অঙ্গন আবার চালু করব কিন্তু কোথায় বসবো ? আমি বলেছিলাম আমার বাড়িতে কিংবা আমাদের সংগঠন গণনাট্যর ঘরে বসার ব্যবস্থা করব ..কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে গেল ..খুব সম্ভবত এপ্রিলের প্রথম দিকে আমার বাড়িতে এসেছিল ..ওর মেয়ের খুব নাটক শেখার ইচ্ছে কোথায় দেবে এইজন্য ..আরও বলল দিদি আমার খুব ইচ্ছে আমার মেয়েটা তোমার মত অভিনয় করুক ..সেই আমার বাড়িতে শেষ আসা ..তারপর লিটল ম্যাগাজিন মেলা.... কত গল্প কবিতা আড্ডা ফটো তোলা সব থেকে গেল । আমি জানি এখন শিলিগুড়িতে আমার অনেক অক্ষর কর্মী ভাইয়েরা আছে যারা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সম্পাদনার সাথে যুক্ত অনুরোধ সবাই মিলে চেষ্টা করে যদি বিবেক ভাইয়ের ছড়ানো-ছিটানো লেখাগুলোকে সংগ্রহ করে একটা কাব্যগ্রন্থ বের করা যায় ..আমার সামর্থ মত আমি সাথে থাকব।

    ReplyDelete